Tringsha Satabdi: Post-Show Comments
ত্রিংশ শতাব্দী:
বোস্টনের মঞ্চ থেকে ফিরে দেখা একটি পুরোনো ছবি
———•••——
কিছু নাটক মঞ্চে শেষ হয়ে যায়। কিছু নাটক মঞ্চের আলো নিভে যাওয়ার পর শুরু হয় দর্শকের ভেতরে।
বোস্টনের Off-Kendrik-এর আয়োজনে বাদল সরকারের ত্রিংশ শতাব্দী দেখতে দেখতে আমার ক্ষেত্রে দ্বিতীয়টিই ঘটল। নাটকটি বহুদিনের পরিচিত ইতিহাসকে হঠাৎ এমন একটি ব্যক্তিগত স্মৃতির সঙ্গে জুড়ে দিল, যার কথা নাটক দেখতে যাওয়ার আগে একবারও ভাবিনি।
ত্রিংশ শতাব্দী মূলত যুদ্ধ, পারমাণবিক অস্ত্র এবং মানুষের নিজের হাতে তৈরি ধ্বংসের বিরুদ্ধে এক গভীর জিজ্ঞাসা।
নাটকের একটি পর্ব আমাকে বিশেষভাবে নাড়া দিল।
১৯৫৪ সালের ১ মার্চ প্রশান্ত মহাসাগরের বিকিনি অ্যাটলে (Bikini Atoll) যুক্তরাষ্ট্র ক্যাসল ব্রাভো নামে একটি থার্মোনিউক্লিয়ার বোমার পরীক্ষা চালায়, তেজস্ক্রিয় ফলআউট ছড়িয়ে পড়ে বিস্তীর্ণ এলাকায়। তার মধ্যে পড়ে যায় জাপানি মাছধরা নৌকা, যেটি Lucky Dragon No. 5 নামেও পরিচিত। নৌকাটির ২৩ জন জেলে তেজস্ক্রিয়তার শিকার হন।
মঞ্চে সেই ঘটনাটি দেখতে দেখতেই হঠাৎ আমার মনে পড়ল একটি মুখ।
স্তানিস্লাভ উলাম (Stanislaw Ulam)।
এই নামটি আমার কাছে শুধু বিজ্ঞানের ইতিহাস থেকে পরিচিত নয়।
আমি যে বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্ডারগ্রাডে প্রাক্তন ছাত্র, Lviv Polytechnic Institute, উলামও সেই প্রতিষ্ঠানেরই ছাত্র ছিলেন, সে আমার জন্মেরও আগে। সেখানেই তিনি গণিত নিয়ে পড়াশোনা করেছিলেন। পরে যুক্তরাষ্ট্রের Los Alamos-এ কাজ করার সময় Edward Teller-এর সঙ্গে তাঁর কাজ থেকে আসে বিখ্যাত Teller–Ulam design, যা আধুনিক থার্মোনিউক্লিয়ার বা হাইড্রোজেন বোমার মূল প্রযুক্তিগত ভিত্তি।
ছাত্রজীবনে বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডোর দিয়ে হাঁটার সময় বিখ্যাত প্রাক্তনীদের ছবির সারিতে উলামের ছবিও দেখেছি বহুবার।
সেটি তখন নিছক একটি ছবি।
একজন বিখ্যাত গণিতবিদ। একজন কৃতী প্রাক্তনী। একই প্রতিষ্ঠানের ছাত্র হিসেবে হয়তো একটু কৌতূহল, একটু পরিচিতির অনুভূতি।
এত বছর পর বোস্টনের একটি অডিটোরিয়ামে বসে এ নাটক দেখতে দেখতে সেই ছবিটিই যেন অন্য অর্থ নিয়ে ফিরে এল।
মঞ্চে তেজস্ক্রিয়তায় আক্রান্ত জেলেদের কথা বলা হচ্ছে। আর আমার মনে ভেসে উঠছে L’vov - সেই করিডোর এবং দেয়ালে ঝোলানো স্তানিস্লাভ উলামের ছবি।
এক মুহূর্তে পৃথিবীর কয়েকটি সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন জায়গা যেন একই রেখায় এসে দাঁড়াল।
বিকিনি অ্যাটলের সমুদ্র (Bikini Atoll)।
লস আলামোসের গবেষণাগার।
Lvov - আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই করিডোর।
আর বহু বছর পরে, বোস্টনের একটি বাংলা নাটকের মঞ্চ।
এই সংযোগের মধ্যে গর্বের চেয়ে আমার অস্বস্তিই বেশি হয়েছে।
কারণ স্তানিস্লাভ উলাম নিঃসন্দেহে অসাধারণ প্রতিভাবান গণিতবিদ ছিলেন। গণিত ও বিজ্ঞানে তাঁর কাজ হাইড্রোজেন বোমার ইতিহাসের চেয়ে অনেক বিস্তৃত। কিন্তু Teller–Ulam design-এর অন্যতম প্রধান উদ্ভাবক হিসেবে থার্মোনিউক্লিয়ার অস্ত্রের ইতিহাসে তাঁর ভূমিকা অনস্বীকার্য।
আর ঠিক এখানেই নাটকটি আমার কাছে আরও গভীর হয়ে উঠল।
নাটকটি যেন উলামকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছে না। বরং আমাদের দাঁড় করাচ্ছে আরও কঠিন একটি প্রশ্নের সামনে:
বিজ্ঞান যা আবিষ্কার করতে পারে, তার সবকিছু কি মানুষের তৈরি করা উচিত?
আর তৈরি করতে পারলেই কি ব্যবহার করার নৈতিক অধিকারও তার জন্মায়?
বাংলা নাটক দেখতে যাওয়ার মধ্যে সাধারণত একটা অন্যরকম আনন্দ থাকে। পরিচিত ভাষা, পরিচিত সাংস্কৃতিক স্মৃতি, পরিচিত মানুষের সঙ্গে কয়েক ঘণ্টা। কিন্তু ত্রিংশ শতাব্দী সেই স্বস্তির মধ্যে থাকতে দিল না।
বোস্টনের নিরাপদ অডিটোরিয়ামে বসে দূর সমুদ্রের তেজস্ক্রিয়তায় আক্রান্ত জেলেদের কথা শুনতে শুনতে আরও একটি প্রশ্ন মাথায় আসে: অন্য মানুষের বিপর্যয় আমাদের কাছে কতক্ষণ বাস্তব থাকে? কখন সেটি ইতিহাস হয়, কখন সংবাদ হয়, আর কখন শুধুই একটি সংখ্যা হয়ে যায়?
আমার ক্ষেত্রে সেই প্রশ্নের সঙ্গে বাড়ি ফিরেছে একটি ছবিও।
L’vov পলিটেকনিকের করিডোরে ঝোলানো স্তানিস্লাভ উলামের সেই বহুবার দেখা ছবি।
আগে ছবিটিতে একজন বিখ্যাত প্রাক্তনীকে দেখতাম। এখন হয়তো ছবিটির সামনে দাঁড়ালে একই সঙ্গে আরেকটি দৃশ্যও মনে পড়বে: প্রশান্ত মহাসাগরে একটি মাছধরা নৌকা, তার ২৩ জন মানুষ, আর আকাশ থেকে ঝরে পড়া তেজস্ক্রিয় ছাই।
সম্ভবত ভালো থিয়েটার ও সুন্দর অভিনয় এটাই করে।
ইতিহাসের সঙ্গে ব্যক্তিগত স্মৃতির এমন একটি যোগসূত্র তৈরি করে দেয়, যার পরে পরিচিত কোনো ছবি আর আগের মতো দেখা যায় না।
আমার মনে তাই শেষ পর্যন্ত একটি প্রশ্নই থেকে গেল:
আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কৃতী প্রাক্তনীদের ছবি দেয়ালে টাঙিয়ে রাখে। কিন্তু ইতিহাস সেই ছবির ফ্রেমের বাইরে আর কোন কোন ছবি টাঙিয়ে রাখে?
মঞ্চের আলো নিভে গেছে।
কিন্তু প্রশ্নটি এখনও নেভেনি।
শেষে একটি কথা না বললেই নয়। এই নাটকে অভিনয় করা অনেকেই আমার ফ্রেন্ডলিস্টে আছেন। আলাদা করে কারও নাম বলছি না, কারণ প্রত্যেকেই অসাধারণ অভিনয় করেছেন। কঠিন একটি নাটকের ভার তাঁরা যে আন্তরিকতা ও সংযমে বহন করেছেন, সেটাই সন্ধ্যাটিকে আমার কাছে আরও স্মরণীয় করে রাখল।
সবাইকে আন্তরিক অভিনন্দন।
Samik Sengupta
Manidip Ghosh
Arkaprabha Nishachor Basu
Disari Deb
Comments